মতুয়া ইতিহাস জানুন - হরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ গনের বিবরণ - Matua History
পূর্বপুরুষ গনের বিবরণ
বহুপূর্বে রাঢ়দেশে রামদাস নামে এক পরম কৃষ্ণভক্ত বসবাস করতেন।
স্বামী-স্ত্রী মিলে একত্রে তীর্থ পর্যটন করে বেড়াতেন। বিভিন্ন তীর্থ বিশেষত কাশী, কাঞ্চি,
মধুপুরী, সরস্বতী, গোদাবরী,
শান্তিপুর, নবদ্বীপ, বৃন্দাবন
ভ্রমণ করেন। এরপর বিষয়-সম্পত্তি ত্যাগ করে স্বামী-স্ত্রী একত্রে পদব্রজে
চন্দ্রশেখর তীর্থে গমন করেন। চন্দ্রশেখরে থাকতেই নবগঙ্গা নদীর নাম শুনে দেখার বড়
ইচ্ছা হয়। তারপর চলে আসেন বর্তমান নড়াইল জেলার লক্ষ্মীপাশায়।
লক্ষ্মীপাশার মানুষ এমন পরম ভক্তের সাহচর্যে এসে তাকে আর স্থান ত্যাগ করতে দিলেন
না। লক্ষ্মীপাশাই তাদের নতুন নিবাস হল।
০১. রামদাসের পুত্র শুকদেব লক্ষ্মীপাশার উত্তরে নবগঙ্গা নদীর পাড়ে
জয়পুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন।
০২. শুকদেবের পুত্র কালিদাস বাসস্থান পাথরঘাটাতে স্থাপন করেন।
তিনি সেখানে তার তিন পুত্র রবিদাস, নিধিরাম ও শ্রীজীবকে
নিয়ে থাকতে শুরু করেন।
০৩। কালিদাসের পুত্র শ্রীনিধিরামের ঘরে মুকুন্দরাম ও কার্তিক নামে
দুই পুত্র জন্ম গ্রহণ করে। তারমধ্যে পুত্র শ্রীমুকুন্দরাম “মোচাই ঠাকুর” নামে
খ্যাতি লাভ করেন।
- যশোমন্ত
- সনাতন
- প্রাণকৃষ্ণ
- রামমোহন ও
- রণকৃষ্ণ।
এই পাঁচ পুত্রের প্রত্যেকেই গুণকর্মে মহৎ ছিলেন। কেউ সাধু, কেউ বৈষ্ণব, কেউ সন্ন্যাসী, কেউ তীর্থবাসী। তাদের গুণকীর্তন তখন
মুখে মুখে প্রচলিত হয় এবং তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এই পরিবারকে “ঠাকুর পরিবার” নামে
আখ্যায়িত করে।
“মোচাই ঠাকুর” নামে খ্যাত
শ্রীমুকুন্দরামের পঞ্চ পুত্রের মধ্যে
জ্যেষ্ঠপুত্রের
ছিলেন যশোমন্ত ঠাকুর। তিনি বিবাহ করেছিলেন ওড়াকান্দির চৌধুরী পরিবারের মেয়ে
শ্রীমতী অন্নপূর্ণা দেবীকে। পরম বৈষ্ণব ছিলেন যশোমন্ত ঠাকুর। বৈষ্ণবদের প্রতি
আনুগত্য ও সেবার কারণে যশোমন্ত ঠাকুরকে যশোমন্ত বৈরাগী
নামেও ডাকা হত।
যশোমন্ত ঠাকুরের ছিল পঞ্চপুত্র এবং দুইজন কন্যা সন্তান।
- কৃষ্ণদাস
- হরিদাস
- বৈষ্ণবদাস
- গৌরীদাস
- স্বরূপদাস এবং দুই কন্যা
- জাহ্নবী দেবী ও
- মালিনী দেবী।
এই হরিদাস ই হলেন মতুয়া ধর্ম দর্শন প্রবর্তক
ও আরাধ্য ভগবান পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর।
ভিডিওতে দেখুনঃ মতুয়া ইতিহাস
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর
মানবকুলে আসিয়ে, যশোমন্ত সুত হয়ে,
জন্ম নিল সফলানগরী।
প্রচারিল গূঢ়গম্য, সূক্ষ্ম সনাতনধর্ম,
জানাইল এ জগত ভরি।।
জন্ম নিল সফলানগরী।
প্রচারিল গূঢ়গম্য, সূক্ষ্ম সনাতনধর্ম,
জানাইল এ জগত ভরি।।
এভাবেই ছন্দবদ্ধভাবে পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জগতে
আগমনের কারন প্রকাশ করেছেন কবি রসরাজ শ্রীমৎ তারক চন্দ্র সরকার তাঁর শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত মহাগ্রন্থের আদিখণ্ডের শুরুতেই। অর্থাৎ
গূঢ়গম্য,
সূক্ষ্ম সনাতন ধর্মের প্রচার এবং রক্ষার জন্যেই শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের এ জগতে বিশেষ করে বৃহৎ বঙ্গে আগমন ঘটে।
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের (মতান্তরে ১৮১১)
খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ এবং ১২১৮ বঙ্গাব্দের ২৯ ফাল্গুন, বুধবার
মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমা,
বর্তমানে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার সফলা নগরিতে
জন্মগ্রহণ করেন।
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ছিল দুই পুত্র ও তিন কন্যা।
পুত্রঃ গুরুচাঁদ ঠাকুর ও উমাচরণ ঠাকুর
কন্যাঃ রোহিণী ঠাকুর , সরমা ঠাকুর ও রাধারাণী ঠাকুর।
যখন কলুষিত মনুবাদী-ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের অধিকর্তা কুটিল ও জটিল
ব্যক্তিগণ নিজ নিজ এবং নিজ জাতির কল্যাণার্থে সত্য-সরল ধর্মাদর্শের বাণীকে লঙ্ঘন
করে নিজ মনসিজ ভ্রান্ত চিন্তা চেতনাকে ঈশ্বররে বাণী রূপ বলে প্রচার করে
শাস্ত্র-গ্রন্থাদি লিখে ছোট-বড়, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য, জাতি-গোত্র-বর্ণাদি তৈরি করে ধর্মকে শাসন-শোষণের যন্ত্রে পরিণত করেছিল,
ঈশ্বরকে মানব লিখিত শাস্ত্রের নিয়ম-কানুনে বদ্ধ করে ফেলেছিল,
সনাতন ধর্মকে আচার সর্বস্ব এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল;
সমাজের তথা সেই ভয়াবহ দুর্দিনে স্বয়ং ক্ষীরোদশায়ী শ্রী হরি স্বনামে
অর্থাৎ শ্রীশ্রী
হরিচাঁদ ঠাকুর নামে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
পূর্ব পূর্ব অবতারগণের বিচরণ ক্ষেত্র বিবেচনা করলে এটা নিশ্চিতভাবে
প্রতীয়মান হয় যে, শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বে অন্য কোন অবতার
পুরুষ সাধারণ মানুষের জন্য আবির্ভূত হন নাই, তারা বিশেষ
বিশেষ কোন কাজের জন্য আবির্ভূত হয়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে স্বধামে গমন করেছেন।
কিন্তু শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এসেছিলেন সাধারণের একজন হয়ে; তিনি
না হয়েছেন রাজা, না হয়েছেন সন্ন্যাসী, না
হয়েছেন যোগী কিংবা ভিক্ষারী, না হয়েছেন ব্রাহ্মণ কিংবা
ক্ষত্রিয়; হয়েছেন তথাকথিত অস্পৃশ্য সমাজের একজন সাধারণ খেটে
খাওয়া মানুষের সন্তান, সাধারণ মানুষ।
সাধারণের মাঝে এসেই অনুভব করেছেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা, মর্ম
বেদনা এবং তাদেরই মুক্তির বাণী শুনিয়েছেন; শুধু শুনিয়ে
ক্ষান্ত হন নাই, পথ দেখিয়েছেন, চলতে
শিখিয়েছেন।
“নীচ হয়ে করিব যে নীচের উদ্ধার।
অতি নিম্নে না নামিলে কিসে অবতার।। অডিও
যখন ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ মানুষের ধর্মের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, মানুষকে
অস্পৃশ্য করে রেখেছে; মন্দিরে প্রবেশাধিকার নেই, ঈশ্বর আরাধনার সুযোগ নাই; শাস্ত্র-গ্রন্থাদি পাঠ
করার অধিকার নাই; সেই সময়ে তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন-
‘ওদের (ব্রাহ্মণ্যবাদীদের) মন্দিরে যাবার দরকার নাই, ওদের
শাস্ত্র-গ্রন্থে আবদ্ধ ঈশ্বর-ভগবানকে ডাকার দরকার নাই; তোরা
ঘরে ঘরে হরি মন্দির তৈরি কর, তাতে আমার (শ্রীহরি) আসন
প্রতিষ্ঠা কর; আমি সেই, আমিই সেই
ক্ষীরোদশায়ী হরি’।
ধর্ম পালন মানেই যখন হয়ে ওঠে সংসার ত্যাগ, সন্ন্যাসী,
বনে গমন; তখন তিনি শুদ্ধ গৃহস্থাশ্রমের কথা
শোনালেন সবাইকে; ধর্ম পালন করার জন্য দরকার নাই সংসার
ত্যাগের, সনাতন সংস্কৃতির চার আশ্রমের এক অপূর্ব সমন্বয়
ঘটালেন তিনি এই এক গৃহ-ধর্ম ক্ষেত্রে। তিনি বললেন-
গৃহেতে থাকিয়া যার হয় ভাবোদয়।
সেই সে পরম সাধু জানিও নিশ্চয়।।
সেই সে পরম সাধু জানিও নিশ্চয়।।
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর প্রবর্তিত মতের নাম মতুয়া। অর্থাৎ মেতে থাকা। সত্য, প্রেম এবং পবিত্রতা এই তিনটি মূল
স্তম্ভের উপরে মতুয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠিত। ঠাকুরের অনুসারীদের মতুয়া বলা হয়। যিনি
মানুষের মধ্যে কোন জাতিভেদাভেদ করেন না ; জীবের মধ্যে যার
দয়ার ভাব প্রবল এবং যিনি সর্বদাই হরিনামে নিষ্ঠার সাথে যুক্ত - তিনিই মতুয়া।
অর্থাৎ যিনি সর্বদা 'হাতে কাম, মুখে নাম' করে ভগবানের দিব্যনাম সংকীর্তনে মাতোয়ারা
তিনিই 'মতুয়া'।
শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথি মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে মহাবারুণী
স্নানের দিনে প্রতিবছর গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে দেশ-বিদেশের লক্ষলক্ষ মতুয়া
ভক্তরা সম্মিলিত হয়ে কামনা সাগর নামক এক দিঘিতে স্নান করে শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের
প্রতি তাদের শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করেন।
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ১২৮৪ বঙ্গাব্দের ২৩ ফাল্গুন এবং ১৮৭৭
খ্রিস্টাব্দের বুধবার তাঁর ইহলীলা সংবরণ করেন। শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর যখন
লীলাবসান করেন তখন তারই সুযোগ্য পুত্র নমঃশুদ্রের জাতির জনক মুক্তিবারিধি শ্রীশ্রী
গুরুচাঁদ ঠাকুর আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এই জাতিকে জাগতিক উন্নয়নের মূলমন্ত্র শেখান। শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার ব্রত গ্রহণ করেন।
জয় হরিচাঁদ, জয় গুরুচাঁদ
No comments